২৫ মাস বয়সী সন্তানের জন্য যা কিছু জানা প্রয়োজন

সাধারন বিষয় গুলোঃ

✅ সাধারণ নির্দেশনা মেনে কাজ করতে পারে।

✅ নিজের কাজের প্রতি অধিক মনোযোগী হয়।

✅ চিৎকার-চেঁচামেচি করার সময় কঠিনভাবে তাকে কাজটি করতে মানা করলে সে চুপ হয়ে যেতে পারে।

? উচ্চতাঃ ৮৬.৩-৮৮.০ সে.মি

? ওজনঃ ১২.৩-১২.৪ কেজি

? মাথার আকৃতিঃ ৪৭.৩-৪৮.৪ সে.মি

মূল পরিবর্তনঃ

এই বয়সের শিশুদের মধ্যে স্বাধীনচেতা মনোভাব অনেক বেশি প্রকাশ পায়। সে তার খেলনা বাছাই, জামা পরা থেকে শুরু করে বিভিন্ন কাজে নিজের মতামত দেওয়া শুরু করে। এমনকি প্রত্যেকটি কাজ সে নিজ হাতে করতে চায়। যে সকল কাজ তার দ্বারা সম্ভব নয় সেগুলো সে করার জন্য জিদ করতে থাকে এবং কারণে-অকারণে হুটহাট করে সে কান্নাকাটি আরম্ভ করে দেয়। আবার নিজে নিজেই থেমে যায়।

দৈহিক পরিবর্তনঃ

আপনার শিশু সন্তান এখন বেশ আত্মবিশ্বাসী হয়ে এই হাঁটাচলা এবং ঘোরাফেরা করে বেড়ায়। তার পায়ের মাংসপেশি গুলো এখন যথেষ্ট মজবুত হয়। সে নিজ থেকে দৌড়াতে দৌড়াতে ঘুরে যেতে পারে আবার ঘরের বিভিন্ন কর্ণারে সে ব্যথা না পেয়ে নিজেই টার্ন নিতে পারে। সিঁড়ি দিয়ে আসে একা একাই ওঠানামা করতে পারে এমনকি সিঁড়ির একধাপ থেকে আরেকধাপে লাফিয়ে নামতে পারে। সে কৌতূহলবশত বিভিন্ন ড্রয়ার এবং পাল্লা বারবার খুলে আর বন্ধ করে। এছাড়াও দরজা লাগানো তার আরেকটি পছন্দের কাজ। তবে এই সময় তার প্রতি অনেক বেশি সতর্ক থাকতে হবে যেন সে হাতে বা শরীরের অন্যান্য স্থানে ব্যথা না পায়। 

? চিন্তার বিষয়ঃ

? যদি সে কোন বস্তু হাতে ধরতে অসুবিধা বোধ করে।

? যদি সে সারাক্ষণই তার পায়ের পাতার উপর ভর দিয়ে হাঁটতে থাকে।

বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবর্তনঃ

আপনার ছোট্ট সোনামণি এখন যেকোন একটি বিষয়ের উপরে কোন যাবত মনোযোগ দিয়ে ব্যস্ত থাকতে পারে। সে খুব সাধারন সমস্যা গুলো সমাধান করার চেষ্টা করে। সে তার বন্ধুদের সাথে খেলা করতে ভালোবাসে এবং অনেকক্ষণ সময় যাবত আপনাকে ভুলে তার খেলার মধ্যে ব্যস্ত থাকে। তবে তার পছন্দের খেলনা কিংবা অন্য কোনো জিনিস যদি নিয়ে নেওয়া হয় তাহলে হয়তো সে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করে এমনকি সেই ব্যক্তিকে আঘাতও করতে পারে। যদি এমন পরিস্থিতি হয় তাহলে তাকে বারবার বুঝিয়ে বলতে হবে যেন এই কাজগুলি সে না করে। 

? চিন্তার বিষয়ঃ

? পরিচিতজনদের ছবি দেখে সে যদি চিনতে না পারে।

? সে যদি তার প্রতিদিনের রুটিনের কাজগুলো করলে করতে না পারে। যেমন ব্রাশ করা, চামচ দিয়ে খাওয়া কিংবা আপনাকে অনুসরণ করা।

মানসিক এবং আচরণগত পরিবর্তনঃ

এই বয়সে শিশুর তার জিদ পূরণের ব্যাপারে অনড় থাকে। সে যখন যেটা বলে সেটা করার জন্য ততক্ষণ পর্যন্ত জিদ করতে থাকে যতক্ষণ না তার কাজটি সে করতে পারে। সে এখনো পুরোপুরি ভাবে অন্য বাচ্চাদের সাথে মিলেমিশে খেলায় অভ্যস্ত হয়না বরং সে নিজে নিজেই খেলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। তার মধ্যে নির্দিষ্ট জিনিস পছন্দ করে বেছে রাখার প্রবণতা দেখা যায়। যেমন সে হয়তো তার নির্দিষ্ট একটি বা দু’টি খেলনা নিয়েই সব সময় খেলা করে এবং বাকি খেলনা গুলি সে অবহেলায় ফেলে রাখে।

? চিন্তার বিষয়ঃ

? যদি আপনার শিশু খেলার সময় কখনই তার সাথীদের সাথে না মিশে।

স্বাভাবিক ঘুমের ধরনঃ

আপনার শিশু এখন নিজে নিজে ঘুমাতে যাওয়ার জন্য উপযুক্ত হয়ে ওঠে। আপনি তাকে এখন থেকেই তার নিজের বিছানায় ঘুম পাড়ানোর অভ্যাস করতে পারেন। তাকে নিয়মিত একই সময়ে ঘুমাতে নিয়ে যাওয়া তার জন্য একটি উপকারী পদক্ষেপ। দুপুরে খাওয়ার পর বাবুকে ঘুম পাড়ানো যেতে পারে। তবে রাতে চেষ্টা করুন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শিশুকে ঘুমাতে নিয়ে যাওয়া এবং সকালে তাকে সকাল সকাল ঘুম থেকে তুলে দেওয়া। ‘আরলি টু বেড অ্যান্ড আরলি টু রাইজ মেক্স অ্যা ম্যান হেলদি, অয়েলদি অ্যান্ড ওয়াইজ’ , এই ধ্রুব সত্য বাক্যটি আপনার সন্তানের জন্য ছোটবেলা থেকেই প্রযোজ্য। 

? চিন্তার বিষয়ঃ

? শিশুর অনিয়মিত ঘুম তার শারীরিক বিকাশের জন্য মোটেও ভাল নয়।

খাবার এবং পুষ্টিঃ

খাবারের ব্যাপারে অনেক শিশুই নানারকম বাহানা খুঁজে এড়িয়ে যেতে চায়। এই সময়ে আপনার উচিত ধৈর্য ধরে তাকে খাওয়ানো। অনেক সময় সে এক জায়গায় বসে খেতে চায়না,কিংবা মুখের মধ্যে খাবার নিয়ে অনেক সময় বসে থাকে। এই অবস্থায় আপনাকে ধৈর্য সহকারে তাকে বুঝিয়ে খাওয়াতে হবে। তাকে খাবারের প্রতি আগ্রহী করতে তার খাবার প্রস্তুতের সময় তাকে সাথে রাখুন আর ব্যাখ্যা করে বলুন কিভাবে তার খাবার তৈরি করা হয়। তাকে আপনাকে সহযোগিতা করতে উৎসাহ দিন। প্রতি বেলার খাবার এর সময় নানা রকম গল্প বলে কিংবা তার সামনে খেলনা রেখে খেলার ছলে তাকে খাওয়ানোর চেষ্টা করুন। তবে মোবাইল বা টেলিভিশন দেখিয়ে বাচ্চাকে খাওয়ানো একদমই ঠিক না। সে যদি প্রতিবেলার খাবার ঠিকমতো খেতে না চায় তাহলে নির্দিষ্ট বিরতি দিয়ে তাকে স্বাস্থ্যকর স্নাক্স আইটেম দেওয়া যেতে পারে। তবে দুপুর বা রাতে ভারি খাবার খাওয়ানোর আগে অন্য কিছু তাকে খেতে দেওয়া যাবেনা। এতে করে পেট ভরে গেলে সে আর কিছুই খেতে চাইবেনা। বাবু সবজি না খেলে সবজি দিয়ে রোল বানিয়ে ভেজে দেওয়া যেতে পারে। কিংবা নুডুলস এর মধ্যে সবজি দিয়ে খাওয়ানো যেতে পারে। ফল খেতে না চাইলে জুস বা স্মুদি বানিয়ে দিতে পারেন। এভাবে নানারকম টেকনিক ব্যাবহার করে আপনার সন্তানের খাওয়াদাওয়া নিশ্চিত করতে হবে

ক্যালরি এবং ফুড চার্টঃ

২৫ মাস বয়সী শিশুর দৈনিক ক্যালরি চাহিদা হলো ১০২৩.৬ কিলোক্যালরি। তার দৈনিক প্রয়োজনীয় নিউট্রিয়েন্ট গুলো-

বুকের দুধ: ৩০০-৩৬০মিলি/দিন।

ফর্মুলা দুধ : প্রয়োজন নেই। 

গরুর দুধ : ৪৭০-৫৯০ মিলি/দিন।

প্রোটিন: ১৩ গ্রাম/দিন।

ফল/ফলের রস:৪০০ গ্রাম/দিন।

শাকসবজি: ১৫০ গ্রাম/দিন।

শস্য দানা: ৮৫ গ্রাম/দিন।

পানি: ৪৭০  মিলি/দিন।

শিশুর দৈনিক ৩ বেলা তার প্রধান খাবার এবং ২বেলা হাল্কা নাস্তা খাবে।১/৩ কাপ থেকে ১ কাপ পরিমাণ খাবার সে প্রতিবেলা খাবে ।

ভাষাগত পরিবর্তন ও উন্নতিঃ

আপনার ২৫ মাস বয়সে ছোট্টটি এখন আপনার সব ধরনের কথাই মোটামুটি‌ বুঝতে পারে এবং সব কথাই বলতে পারে। সে ছোট ছোট বাক্য ব্যাবহার করে কথা বলে। এই সময় সে আপনাকে প্রচুর প্রশ্ন করবে। আপনি তার সাথে যেভাবে কথা বলেন সে তার খেলনা পুতুলের সাথেও একই রকম ভাবে কথা বলার চেষ্টা করে। সে নিজেকে সবার কাছে তার নাম ধরে প্রকাশ করতে পছন্দ করে। সে প্রায় ৫০থেকে ৭৫ টি শব্দ ব্যাবহার করে যার অর্ধেকই বাইরের মানুষরা বুঝতে পারে।সে ১ থেকে ৫ কিংবা ১০ পর্যন্ত গুনতে পারে, এছাড়া রঙের নাম বলতে পারে। সে সারাক্ষন  ‘কি’ এবং ‘কেন’ দিয়ে প্রশ্ন করতে থাকে। এই সময়ে চেষ্টা করুন সংক্ষেপে এবং টু দ্যা পয়েন্টে তার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার।

যেসব বিষয়ে সাবধান থাকতে হবেঃ

আপনার ছোট্ট সোনামণিকে বাহিরের নিয়ে গেলে সব সময় তার উপরে নজর রাখুন। এই বয়সেও শিশুরা পড়ে গিয়ে কিংবা দরজা, জানালা, ড্রয়ারের সাথে হাতে বা পায়ে আঘাত পেয়ে ব্যথা পেতে পারে। যেহেতু সে এখন সব ধরনের কাজ নিজে নিজে করতে চায় তাই তাকে সাহায্য করার কথা বলে তার সাথেই থাকুন এবং তার দিকে নজর রাখুন।

অভিভাবকদের জন্য টিপসঃ

আপনার সন্তানের সাথে নিয়মিত সময় কাটানোর মধ্য দিয়ে আপনি তার শৈশবকে আরও বেশি প্রাণবন্ত করে তুলতে পারেন। আপনি বিভিন্নভাবে তার সাথে খেলায় যুক্ত হতে পারেন ।তার সাথে লুকোচুরি খেলা কিংবা ক্র্যাফট করার মধ্য দিয়ে তার বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নতি ঘটবে। তার সাথে গান করা কিংবা আপনার কাজকে বিস্তারিতভাবে তাকে বর্ণনা করলে সে ভাষা ব্যাবহারে আরও পরিপক্ক হবে। তাকে নিয়মিত বাইরে খোলা জায়গায় অথবা পার্কে খেলতে নিয়ে যান।  খেলার সময় তাকে বল ছুড়ে দিন এবং সেটি পুনরায় আপনার কাছে পাঠাতে ছুঁড়ে মারতে বলুন। তার সাথে রং পেন্সিল নিয়ে আঁকাআঁকি করুন এবং খেলাচ্ছলে তাকে বিভিন্ন রং এর নাম শিখিয়ে দিন। বই পড়ার সময় আপনার শিশুকে বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টে দিতে বলুন। তার পাজেল সলভিং এর সময় কিংবা কোন প্রজেক্ট কমপ্লিট করার সময় তার সাথে থাকুন এবং তাকে সাহায্য করুন। তাই বলে সব কিছুই আপনি তাকে করে দিবেন না বরং তার সাথে থেকে তাকে উৎসাহিত করুন। তাকে নিয়মিত বাহিরে খেলার মাঠে খেলতে নিয়ে যান। এছাড়াও ঘরে আপনাকে ছোটখাটো কাজে সাহায্য করতে উৎসাহিত করুন।তাকে সবার সাথে মিশতে উৎসাহিত করুন। সে যদি বেশি জেদ করে কিংবা অন্যকে আঘাত করে তাহলে তাকে সেটি করতে নিরুতসাহিত করুন। হতে পারে আপনি তাকে শাস্তি হিসেবে তার কোন একটি পছন্দের খেলনা তার থেকে নিয়ে নিলেন কিংবা কিছু সময়ের জন্য কথা  বলা বন্ধ করে দিলেন। এভাবে আস্তে আস্তে তাকে ভাল ও খারাপের মধ্যে পার্থক্য করতে শেখান।