বেবি ব্লুজ এর আদ্যোপান্ত

আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষই এখনও এই বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানেনা ফলে এর গুরুত্বটিও বুঝেনা। বেবি ব্লুজ সম্পর্কে শুধু মা’র একার জানলে হবেনা, পুরো পরিবারকেই জানতে হবে এবং নতুন মায়ের প্রতি যত্নশীল হতে হবে। কারণ যত্ন, ভালবাসা আর বিশ্রাম মাকে এই বিষণ্ণতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে।

বেবি ব্লুজ কি? অনেক নতুন মাকেই হালকা ক্ষণস্থায়ী একটি বিষণ্ণতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। সন্তান প্রসবের পরপর মনমরা হয়ে যাওয়া, কান্না আসা- এ ব্যাপারগুলো একদম স্বাভাবিক। মাতৃত্বের প্রথম দিনগুলি একই সাথে অনেক আনন্দপূর্ণ এবং ক্লান্তিকর। এই সময়ে মা’র এমনসব বিষয়ে কান্না আসে যা আগে হয়তো সে খেয়ালও করেনি। এছাড়া, সারাক্ষণ দুশ্চিন্তা কাজ করে যে কিভাবে ভাল মা হওয়া যায়। সন্তান প্রসবের প্রথম দু’সপ্তাহের মধ্যে এই প্রতিটি অনুভূতিই স্বাভাবিক। ৪০ থেকে ৮০ শতাংশ মাকেই এই অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, যা বেবি ব্লুজ নামে পরিচিত।

বেবি ব্লুজ হবার কারণঃ

শারীরিক কিংবা মানসিক পরিবর্তন অথবা উভয় পরিবর্তনের কারনেই বেবি ব্লুজ হতে পারে। প্রসবের পরে খুব দ্রুত শারীরিক পরিবর্তন হয়। হরমোন লেভেলের দ্রুত পরিবর্তন, বুকের দুধ তৈরি হওয়া, ঘুম না হওয়া- এই শারীরিক কারণগুলি যথেষ্ট বেবি ব্লুজ হওয়ার জন্যে। আর মানসিক কারণ হতে পারে- সন্তানের চিন্তায় সারাক্ষন উদ্বিগ্ন থাকা, নতুন রুটিনের সাথে নিজেকে খাপ খাওয়ানো, নতুন দায়িত্বকে ভয় পাওয়া ইত্যাদি।

বেবি ব্লুজ এ যা করণীয়ঃ একজন নতুন মা এই সময়ে ছোট্ট মানুষটির প্রতিটি প্রয়োজন মেটাতে থাকার ভয়ানক নতুন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে এমনভাবে যায় যে সে নিজের যত্ন নিতেও ভুলে যায়, যেটা খুবই ভুল। নিজের যত্ন সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ঘুম হওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। তাই শিশু যখন ঘুমাবে তখন কে কি ভাবছে না ভাবছে তা নিয়ে না ভেবে আপনিও ঘুমানোর চেষ্টা করুন। যদি সম্ভব হয়, শিশুকে মাঝমধ্যে তার বাবার কাছে দিয়ে একটু গাঢ় ঘুম দেবার চেষ্টা করুন। হালকা ব্যায়াম মন ভাল করার একটি দারুন উপায়। প্রতিদিন একটু হাটার চেষ্টা করুন। হাটার জন্যে দূরে কোথাও যে যেতে হবে তা না, বাসায় ছাদেই বিকেল বেলা একটু হাটুন। মায়ের এই কঠিন সময়টি সহজ করতে পারে পরিবারের ভালবাসা, যত্ন এবং সাপোর্ট। আপনার পার্টনারের এবং পরিবারের কাছের মানুষের সাথে কথা বলুন, শেয়ার করুন অনুভূতি। তাদের সুযোগ দিন আপনার যত্ন নেবার। দেখবেন এতে বেশ হালকা লাগছে। সবথেকে বড় কথা ধৈর্য্য ধরে রাখা, মনে রাখতে এটি ক্ষণস্থায়ী। খুব শীঘ্রই আপনি ভাল বোধ করবেন।

বেবি ব্লুজ নাকি প্রসব পরবর্তী বিষণ্নতা?

এই দুটি জিনিসকে এক মনে হতে পারে কারণ এদের লক্ষণগুলি একই। পার্থক্যটা হচ্ছে দুটির স্থায়িত্বে আর গভীরতায়। বেবি ব্লুজ হালকা ও ক্ষণস্থায়ী, এর জন্যে কোন চিকিৎসার প্রয়োজন নেই কারন এটি সময়ের সাথে নিজে থেকেই চলে যায়। কিন্তু Postpartum Depression (PPD) বা প্রসব পরবর্তী বিষণ্নতা বেশ তীব্র এবং স্থায়ী। যত দ্রুত সম্ভব এই বিষণ্ণতার চিকিৎসা নেয়া উচিৎ।

কিভাবে বুঝবেন যে আপনি প্রসব পরবর্তী বিষণ্নতায় ভুগছেন?

প্রসবের পর প্রথম দুই সপ্তাহ বিষণ্নতা স্বাভাবিক। কিন্তু যদি এই বিষণ্নতা দুই সপ্তাহ পরও রয়ে যায় তাহলে অবহেলা না করে অবশ্যই দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিৎ। তা না হলে এই বিষণ্ণতা মানসিক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে ফলে মা ও শিশু দুজনেরই ক্ষতি হতে পারে।

পরিবারের করণীয় যাঃ

আপনি শিশুর বাবা, নানা- নানি, দাদা- দাদি, খালা- ফুপু যেই হয়ে থাকুন না কেন নতুন মায়ের প্রতি আপনার কিছু দায়িত্ব আছে। পরিবারের সদস্য হিসেবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে জিনিসটি আপনি করতে পারেন তা হল নতুন মাকে আশ্বস্ত করা যে এই বিষণ্ন ও মনমরা অনুভূতিটি স্বাভাবিক এবং অনেক নারীই জন্ম দেওয়ার পরে এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়। নতুন মা’র কথা শুনুন এবং তাকে মানসিক সমর্থন দিন। প্রয়োজন হলে তাকে বলুন কাঁদতে কারণ কাঁদলে তার হালকা লাগবে কিছুটা। তাকে উৎসাহ দিয়ে বলুন যে সে একজন চমৎকার মা। নতুন শিশুকে অনেকেই দেখতে আসে বাসায়, শিশুর মা যদি ক্লান্ত অনুভব করে তাহলে তাকে জোর করে মেহমানের সাথে দেখা করাবার প্রয়োজন নেই। শিশুকে আপনি নিয়ে যান দেখা করাতে এবং মাকে বলুন একটু রেস্ট নিতে। সর্বোপরি, যত্ন ও ভালবাসা দিয়ে নতুন মাকে বুঝিয়ে দিন যে আপনি বা আপনারা পুরো পরিবার তার পাশে আছেন সবসময়। মনে রাখবেন, যদি বিষণ্ণতার স্থায়িত্ব দুই সপ্তাহের বেশি হয় তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।