আমরা আমাদের সন্তানদের হাত ধোয়া বা দাঁত ব্রাশ করার মতো মৌলিক পরিচ্ছন্নতা শেখালেও নখের যত্নের বিষয়টি প্রায়ই ভুলে যাই। অথচ নখের যত্ন নেওয়া পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি শিশুকে নিজের কাজ নিজে করার অনুভূতি এবং দায়িত্ববোধও শেখায়। সবসময় সুস্থ ও পরিচ্ছন্ন নখ রাখার এই অভ্যাসটি শিশুদের ছোটবেলা থেকেই গড়ে তোলা প্রয়োজন। তাছাড়া, অনেক সময় নখ দেখেই শিশুর ভেতরের বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা আগে থেকেই টের পাওয়া যায়।
বাবা-মায়েদের জন্য শিশুর নখের যত্নকে সহজ ও আনন্দদায়ক করতে নিচে কিছু সহজ পরামর্শ দেওয়া হলো:
নিয়মিত হাত ধোয়া এবং শুকানো
নিয়মিত ও সঠিক নিয়মে হাত ধোয়া হলো নখের যত্ন নেওয়ার প্রথম ধাপ। শিশুরা ভালো করে হাত ধুলে জীবাণু দূর হয় এবং নখের নিচের জমে থাকা ময়লাও পরিষ্কার হয়ে যায়। খেয়াল রাখুন যেন হাত ধোয়ার সময় আঙুলের ডগা ও নখও ভালোভাবে পরিষ্কার হয়। আপনার শিশুকে বাথরুম ব্যবহারের পর, বাইরে থেকে এসে, এবং খাওয়ার আগে অবশ্যই হাত ধোয়া শেখান।
হাত ভেজা থাকলে শিশুদের হাত ভালোভাবে শুকানোও গুরুত্বপূর্ণ। নখ বেশিক্ষণ ভেজা থাকলে নখে ফাঙ্গাল ইনফেকশন হতে পারে।
নখ ময়েশ্চারাইজড রাখা
নখ সুস্থ ও নমনীয় রাখতে নিয়মিত ময়েশ্চারাইজ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে শীতকালে বা শুষ্ক আবহাওয়ায় নখ সহজেই ফেটে বা ভেঙে যায়। সবচেয়ে ভালো সময় হলো হাত ধোয়ার পর অথবা গোসলের পরপরই লোশন লাগিয়ে দিলে।
নখের যত্নের বিষয়ে বুঝিয়ে বলুন
নখের যত্ন কেন জরুরি তা স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে বলুন, যেমন, বড় নখ দিয়ে আঁচড় লেগে অন্যের ব্যথা লাগতে পারে। নখ দেখে যে নিজের সুস্থতা বোঝা যায় তাও শিখাতে পারেন।
নখ কাটা শুরুর আগে আপনার শিশুকে ধাপে ধাপে বুঝিয়ে বলুন কী হতে যাচ্ছে, যাতে সে বুঝতে পারে কি হতে চলেছে। প্রথমে নিজের নখে কেটে দেখাতে (demonstrate) পারেন। তাকে আশ্বস্ত করতে বলতে পারেন, “আমরা এখন নেইল কাটার দিয়ে তোমার নখগুলো ছোট করবো, এতে তোমার একটুও ব্যথা লাগবে না।” শিশুদের ভয় কমাতে এবং নখের যত্নের গুরুত্ব বোঝাতে এ সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্টুন দেখাতে পারেন অথবা মজার গল্পের বই পড়ে শোনাতে পারেন।
নখ ছোট রাখুন
নখ কেটে ছোট রাখলে তা পরিষ্কার থাকে এবং সহজে ভাঙে না। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা (dermatologists) পরামর্শ দেন যে, শিশুর বয়স ৯-১০ বছর না হওয়া পর্যন্ত বাবা-মা বা প্রাপ্তবয়স্কদেরই নখ কেটে দেওয়া উচিত। এই বয়সের পর শিশু স্বচ্ছন্দ বোধ করলে নিজের নখ নিজে কাটার অভ্যাস করতে পারে। ৪-৫ বছরের শিশুরা নিজের নখ না নিজে না কাটলেও নখের অন্যান্য যত্ন অবশ্যই শিখাতে পারেন।
হাত ও পায়ের নখ কাটা:
আপনার সন্তান যখন নিজের নখ নিজে কাটতে শিখবে, তখন তাকে নিচের এই নিয়মগুলো ধাপে ধাপে শেখান:
- নেইল কাটার ও নেইল ফাইলের মতো সঠিক টুল ব্যবহার করে নখ কাটুন। শিশুদের নখ কাটার জন্য বড়দের সাধারণ নেইল কাটার ব্যবহার না করাই ভালো। এতে ত্বক কেটে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। শিশুদের জন্য বাজারে বিশেষ ‘বেবি নেইল কাটার’ পাওয়া যায়, যা অনেক বেশি নিরাপদ।
- গোসলের পর নখ কাটুন। তখন নখ নরম থাকায় নখ কাটা সহজ হয়।
- হাতের নখ কাটার সময় প্রথমে সোজাভাবে কাটুন। তারপর নখের কোণাগুলো নেইল ফাইল দিয়ে একটু মসৃণভাবে গোল করে দিন। এতে নখ মজবুত থাকে।
- পায়ের নখ সবসময় একদম সোজাভাবে কাটুন। এতে নখের কোণা ভেতরের দিকে বেঁকে যাওয়ার বা নখ চামড়ার ভেতরে ঢুকে যাওয়ার (Ingrown Nail) ঝুঁকি কমে। পায়ের নখের কোণা বেশি গোল বা বেশি ছোট করে ফাইল করবেন না, কারণ এতেও Ingrown Nail হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
- হাত-পায়ের নখ কাটার পর ধারালো বা অমসৃণ কোণাগুলো মসৃণ করতে নেইল ফাইল ব্যবহার করুন। নেইল ফাইল সবসময় নখের ওপর একদিকে ঘষুন। সামনে-পেছনে বা আপাশ-ওপাশ করে ঘষলে নখ দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
- নখ কাটার পর অবশ্যই হাত ভালো করে সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে, যাতে কাটা নখের ছোট টুকরো বা জীবাণু ত্বকে বা মুখে না যায়।
- কিউটিকল কখনো কাটবেন না। কিউটিকল (নখের গোড়ার চামড়া) যেভাবে আছে সেভাবেই রাখুন। এটি নখের মূল অংশকে ইনফেকশন থেকে রক্ষা করে। তাই এটি কাটা বা ভেতরের দিকে ঠেলে দেওয়া উচিত নয়।
নখের কোণার আলগা চামড়ার যত্ন
আপনার সন্তানের নখের কোণায় কোনো আলগা চামড়া ঝুলে থাকলে তা কখনো কামড়ে বা টেনে ছিঁড়ে ফেলতে দেবেন না, কারণ এতে ইনফেকশন হতে পারে। এর পরিবর্তে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নেইল কাটার দিয়ে চামড়াটি সাবধানে কেটে ফেলুন।
নখ কামড়ানোর অভ্যাস দূর করুন
অনেক শিশুরই নখ কামড়ানো বা খুঁটে ফেলার অভ্যাস থাকে, যা নখের আকৃতি নষ্ট করে এবং মুখে জীবাণু ছড়ায়। শিশু কেন নখ কামড়াচ্ছে (যেমন: মানসিক চাপ বা একাকীত্ব) তা বোঝার চেষ্টা করুন। নখ ছোট রাখলে এবং শিশুকে অন্য কাজে ব্যস্ত রাখলে এই অভ্যাস আস্তে আস্তে কমে আসে।
স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ানো
সুষম খাদ্য সামগ্রিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি নখের স্বাস্থ্যেও সহায়ক। আপনার শিশুর খাদ্যতালিকায় কলিজা, দুধ, চিনাবাদাম, ডিম, ছোট মাছ, লেবু এবং শাকসবজির মতো খাবারগুলো অবশ্যই রাখুন।
প্রাকৃতিক নেইল পলিশ ব্যবহার করুন
আপনার শিশু যদি নেইল পলিশ দিতে ভালোবাসে, তাহলে সাধারণ নেইল পলিশের বদলে প্রাকৃতিক ও টক্সিন-মুক্ত (Toxin-free) নেইল পলিশ বেছে নিন। কারণ সাধারণ নেইল পলিশে ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকে। তবে নেইল পলিশ মাসে একবার বা দুবারের বেশি ব্যবহার না করাই ভালো।
পায়ের নখের বিশেষ যত্ন
পায়ের নখ চোখের আড়ালে থাকে বলে সেগুলোর যত্ন কম দেওয়া উচিত নয়। পায়ের নখ সুস্থ রাখতে নিচের বিষয়গুলো মেনে চলুন:
- জুতা কেনার সময় খেয়াল রাখুন যেন জুতার ভিতর পায়ের আঙুল নড়াচড়ার জন্য যথেষ্ট জায়গা থাকে। আঁটসাঁট জুতো পরলে পায়ের নখ চামড়ার ভেতর ঢুকে গিয়ে ব্যথা সৃষ্টি করতে পারে।
- প্রতিদিন মোজা বদলান। প্রতিদিন পরিষ্কার ও শুকনো মোজা পরা অত্যন্ত জরুরি। নোংরা বা ভেজা মোজা থেকে নখে ফাঙ্গাল ইনফেকশন হতে পারে।
- খালি পায়ে কখনো পাবলিক প্লেসে হাঁটবেন না। সমুদ্র সৈকত, সুইমিং পুল বা হোটেলের বাথরুম মতো পাবলিক প্লেসে খালি পায়ে হাঁটলে নখে ইনফেকশন হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
নখের কিছু সাধারণ সমস্যা
সাধারণত শিশুদের নখ গোলাপি ও মসৃণ থাকে। তবে ছোটবেলা থেকেই নিয়মিত নখ পরীক্ষা করার অভ্যাস করা ভালো, কারণ শরীরের কিছু স্বাস্থ্য সমস্যার প্রথম লক্ষণ নখেই দেখা যায়। শিশুদের ক্ষেত্রে সাধারণত যে সমস্যাগুলো বেশি দেখা যায়:
- ইনগ্রোন নখ (Ingrown Nail): নখ ভেতরের দিকে বেঁকে চামড়ার নিচে ঢুকে যায়, যার ফলে ব্যথা হয় এবং কখনো কখনো ইনফেকশন হতে পারে।
- নখের আঘাত (Nail Injury): পায়ের আঙুলে কিছু পড়ে গেলে বা আঙুলে জোরে চাপ লাগলে নখের নিচে কালো দাগ দেখা দিতে পারে এবং কখনো কখনো নখ খসে যেতে পারে।
- নখের বিকৃতি (Nail Deformity): অতিরিক্ত নখ কামড়ালে বা পুষ্টির অভাব ও ইনফেকশন হলে নখ স্বাভাবিক মসৃণতা হারিয়ে ফেলে। তবে নখের ইনফেকশন জন্যও এমন হতে পারে।
- নখের ইনফেকশন: নখের চারপাশ লাল হয়ে যাওয়া, ফুলে যাওয়া, পুঁজ হওয়া বা তীব্র ব্যথা হওয়া ইনফেকশনের লক্ষণ।
সামান্য নখের আঘাত বা হ্যাংনেইলের মতো সমস্যা সাধারণত বাড়িতেই ময়েশ্চারাইজার বা অ্যান্টিসেপটিক দিয়ে সামলানো যায়। কিন্তু ইনফেকশন বা গুরুতর নখের আঘাতের লক্ষণ দেখলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
শেষ কথা
যতদিন না শিশু নিজে সঠিকভাবে নখ কাটতে শিখছে, ততদিন আপনার শিশুর নখ পরিষ্কার ও কাটার সময় সবসময় বাড়তি মনোযোগ দিন। শৈশবের এই ছোট্ট যত্নটিই বড় হয়ে তাদের দৈনন্দিন স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের একটি স্থায়ী অংশ হয়ে উঠবে।