আপনার নবজাতকের ত্বক কেন উঠছে?

আপনার নবজাতকের নরম, কোমল ত্বকের অনুভূতি সত্যিই অতুলনীয়। তাই জন্মের কয়েকদিন পর সেই মসৃণ ত্বক উঠতে শুরু করলে স্বাভাবিকভাবেই আপনার দুশ্চিন্তা হতে পারে। তবে এটি অপ্রত্যাশিত মনে হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। আসল বিষয় হলো, এই সময়ে শিশুর ত্বকের কোন পরিবর্তনগুলো স্বাভাবিক তা জানা এবং সেই অনুযায়ী সঠিক যত্ন নেওয়া।

নবজাতকের ত্বক ওঠা কি স্বাভাবিক?

হ্যাঁ, একদম স্বাভাবিক। প্রায় সব নবজাতকই জীবনের প্রথম ১ থেকে ৩ সপ্তাহের মধ্যে ত্বক ওঠার এই ধাপের মধ্য দিয়ে যায়। জন্মের সময় আপনার শিশুর গায়ে ভার্নিক্স নামে সাদা সুরক্ষামূলক আবরণ থাকে। মায়ের গর্ভের বাইরের পরিবেশে মানিয়ে নিতে ত্বকের বাইরের পুরনো স্তরটি ঝরে যায় যেন ভেতরের নতুন সুস্থ ও সতেজ ত্বক জায়গা করে নিতে পারে।

ত্বক কতটা উঠবে, তা সব শিশুর জন্য এক নয়। যেসব শিশুর জন্মের সময় শরীরে ভার্নিক্স বেশি থাকে (যেমন প্রি-ম্যাচিউর শিশু), তাদের ত্বক সাধারণত কম ওঠে। পূর্ণ ৪০ সপ্তাহ বা তার পরে জন্মানো শিশুদের ত্বক তুলনামূলক একটু বেশি উঠতে পারে। এটি সাধারণত প্রথম এক মাসের মধ্যেই কোনো বাড়তি যত্ন ছাড়াই এমনিতেই ভালো হয়ে যায়।

নবজাতকের ত্বক ওঠা সাধারণত কখন বন্ধ হয়?

প্রতিটি শিশুই আলাদা, তবে নবজাতকদের স্কিন উঠার এই বিষয়টি চিরকাল স্থায়ী হয় না। সাধারণত জন্মের পর প্রথম এক মাসের মধ্যেই শিশুর স্কিন বাহিরের পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়। এতে শিশুর স্কিন উঠাও বন্ধ হয়ে যায়।

ত্বক উঠলে দেখতে কেমন হয়?

ত্বক ওঠা খুবই স্পষ্ট এবং সাধারণ একটি লক্ষণ, তাই এটি সহজেই চোখে পড়ে। তাছাড়াও আপনার শিশুর ত্বকে এই লক্ষণগুলো দেখলে বুঝবেন সে স্বাভাবিক ত্বক ওঠার ধাপের মধ্য দিয়েই যাচ্ছে:

  • ত্বক ভুসির মতো কুচি কুচি করে ওঠা
  • ত্বক কিছুটা ফেটে যাওয়ার মতো ভাব
  • ত্বকে বিবর্ণ বা ছাই রঙের ভাব
  • শুষ্ক ও খসখসে ছোপ ছোপ দাগ
  • হালকা লালচে ভাব

এটি দেহের যেকোনো জায়গায় এটি হতে পারলেও সাধারণত হাত, কবজি, পিঠ, পা ও গোড়ালিতে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। ত্বকের ভাঁজগুলোতে এই ওঠা ত্বক বেশি চোখে পড়তে পারে। 

বিভিন্ন ত্বকের রং অনুযায়ী নতুন ত্বকের রং:

ত্বকের রং  (Skin Tone)উঠে যাওয়া ত্বকের রংভেতরের নতুন ত্বকের রং
হালকা/ফর্সাউজ্জ্বল সাদা, হলদেটেগোলাপি, লালচে
বাদামী/মাঝারিহালকা সাদা, ধূসর, ছাই রঙহালকা বাদামী, লালচে-বাদামী
কালো/গাঢ়গাঢ় সাদা, রূপালী, হালকা ধূসরগাঢ় বাদামী, কালো

আপনার নবজাতকের ত্বক উঠলে কি করবেন?

নবজাতকের শুকনো বা ওঠা ত্বকের সবচেয়ে ভালো যত্ন হলো এটিকে স্বাভাবিকভাবে উঠতে দেওয়া। প্রথম দেখায় আপনার হয়তো উঠে যাওয়া ত্বক টেনে তুলতে ইচ্ছে হতে পারে। তবে ত্বক টেনে বা ঘষে তুলবেন না (আমরা জানি, ত্বক উঠলে তা টেনে তোলার ইচ্ছে সামলানো কঠিন!)। এতে আপনার শিশুর নতুন কোমল ত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বা জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই শিশুর ত্বকের যত্ন করার আগে নিজের হাত পরিষ্কার করাও জরুরি।

ত্বক অতিরিক্ত শুকিয়ে যাওয়া বা ফেটে যাওয়ার চিন্তা হলে কিছু সহজ যত্ন আপনার শিশুর ত্বককে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করতে পারে।

গোসল করানোর সময় কোমলভাবে পরিষ্কার করুন

নবজাতকের নাভির নাড়ি শুকিয়ে পড়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত স্পঞ্জ বাথ করানো ভালো। অর্থাৎ পানিতে পুরো শরীর না ডুবিয়ে নরম কাপড় বা হাত দিয়ে আলতোভাবে পরিষ্কার করুন। তবে গোসলের পর মোছার সময় খুব বেশি ঘষাঘষি করবেন না।

রাসায়নিক ও সুগন্ধি এড়িয়ে চলুন

কেমিক্যাল উপাদান শিশুদের কোমল ত্বকে জ্বালাপোড়া করতে পারে। তাই শিশুর শ্যাম্পু, ক্লিনজার বা লোশন বেছে নেওয়ার সময় সুগন্ধিবিহীন পণ্য ব্যবহার করুন। নবজাতকের কাপড় সাধারণ ডিটারজেন্ট দিয়ে না ধুয়ে, শিশুদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি ডিটারজেন্ট ব্যবহার করুন। কাপড় ধোয়ার সময় ফ্যাব্রিক সফটনার ব্যবহার করা থেকেও বিরত থাকুন।

হাইড্রেটেড রাখুন

পর্যাপ্ত বুকের দুধ বা ফর্মুলা খাওয়ালে, শিশুর শরীর হাইড্রেটেড থাকলেও ত্বকের শুষ্কতা কমে। তবে ছয় মাস বয়সের আগে কখনোই শিশুকে পানি খাওয়াবেন না। 

আবহাওয়া অনুযায়ী যত্ন নিন

গরমের দিনে শিশুকে হালকা, আরামদায়ক সুতি কাপড় পরাবেন। বাহিরে রোদে বের হলে ক্যাপ পরালে মুখ, কান এবং ঘাড়ের পেছনের অংশ সুরক্ষিত থাকে। সরাসরি রোদে না রেখে ছায়ায় রাখুন।

শীতের দিনে নবজাতকের ত্বক যেন ঠান্ডা বাতাস না লাগে তা খেয়াল রাখুন। প্রয়োজনে তাদের হাত ও পায়ে মোজা বা গ্লাভস পরিয়ে দিন। তবে তাদের অতিরিক্ত কাপড় পরালে অস্বস্তিবোধ করতে পারে এবং ঘেমে যেতে পারে।

বেশি সময় ধরে গোসল করাবেন না

গরম পানিতে বেশি সময় ধরে গোসল করালে ত্বকের প্রাকৃতিক তেল নষ্ট হতে পারে। তাই ৫ থেকে ১০ মিনিটে এবং সপ্তাহে দুই বা তিনবার গোসল করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। গোসলের পর আলতোভাবে শরীর মুছে সঙ্গে সঙ্গে ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে দিন।

গরম পানির পরিবর্তে কুসুম গরম পানি এবং শুধুমাত্র সুগন্ধিহীন ও সাবানমুক্ত ক্লিনজার ব্যবহার করুন। সাধারণ সাবান এবং বাবল বাথ নবজাতকের ত্বকের জন্য খুবই ক্ষতিকর।

ত্বক ময়েশ্চারাইজড রাখুন

ত্বক ওঠার এই সময় ভ্যাসলিন, পেট্রোলিয়াম-ভিত্তিক ময়েশ্চারাইজার ও অলিভ অয়েল (শিশুর ত্বকে সরিষার তেল একদমই দিবেন না) ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশেষ করে গোসলের পর এবং দিনে ২–৩ বার লাগালে শুষ্কতা কমে।

এতে নতুন ত্বকও সুস্থ ও সুরক্ষিত থাকে। ত্বক ওঠা বন্ধ হওয়ার পরও প্রথম কয়েক মাস নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা ভালো।

কখন ত্বক ওঠা কোনো ত্বকের সমস্যার লক্ষণ হতে পারে?

কখনও কখনও স্কিন উঠা কোনো চর্মরোগের লক্ষণ হতে পারে। আপনার শিশু বিশেষজ্ঞ বা চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ এই সমস্যাগুলো শনাক্ত করতে এবং নিরাপদ ও কার্যকর চিকিৎসার পরামর্শ দিতে পারেন। এই চর্মরোগগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • ক্রেডল ক্যাপ (Cradle Cap): শিশুর মাথার ত্বক উঠলে তা ক্রেডল ক্যাপের লক্ষণ হতে পারে। এতে লালচে ভাব, হলদেটে খোসা, তৈলাক্ত দাগ বা মাছের আঁশের মতো শক্ত আবরণ দেখা যেতে পারে। এটি সাধারণত মাথার ত্বকে হয়, তবে শরীরের অন্য জায়গাতেও হতে পারে। এটি ছোঁয়াচে নয় এবং সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

সাধারণত নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়। কখনো অ্যান্টিফাঙ্গাল জেল, ক্রিম, লোশন বা শ্যাম্পু ব্যবহার করতে হতে পারে। এক মাসেও উন্নতি না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

  • একজিমা (Eczema): একজিমার কারণেও ত্বক শুকিয়ে উঠতে পারে। শিশুর ত্বকের রঙ অনুযায়ী লালচে বা র‍্যাশের মতো দেখাতে পারে এবং চুলকানিও হতে পারে। জন্মের পরপর এটি কম দেখা গেলেও শৈশবের পরে হতে পারে। সাধারণত মুখ বা মাথার ত্বকে বেশি হয়।
  • ইচথিওসিস (Ichthyosis): এটি একটি জেনেটিক সমস্যা, যেখানে ত্বকের ওপর অতিরিক্ত স্তর তৈরি হয়। ত্বক প্লাস্টিকের আবরণের মতো দেখাতে পারে। এতে ত্বক ওঠা, শুষ্কতা, লালচে ভাব, খসখসে বা আঁশের মতো ত্বক এবং চুলকানি হতে পারে।

এর পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার জন্য কোনো চিকিৎসা নেই, তবে নিয়মিত ত্বকের যত্ন ও ক্রিম ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

  • সোরিয়াসিস (Psoriasis): এতে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার (immune-mediated) কারণে ত্বকে উঁচু, পুরু, রূপালী আঁশের মতো দাগ দেখা দেয়। শিশুর অনেকদিন পরও ডায়াপার র‍্যাশ, ক্র্যাডল ক্যাপ বা ইস্ট ইনফেকশন থাকলে, এটি সোরিয়াসিসের লক্ষণ হতে পারে।

সোরিয়াসিসের কোনো প্রতিকার নেই, তবে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য চিকিৎসা রয়েছে। 

  • কন্ট্যাক্ট ডার্মাটাইটিস (Contact Dermatitis): নির্দিষ্ট সাবান, লোশন, ডিটারজেন্ট বা অন্য কিছু ব্যবহারে অ্যালার্জি বা প্রদাহের কারণে ত্বক উঠতে পারে।

কখন ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করবেন?

স্বাভাবিক ত্বক ওঠা সাধারণত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ঠিক হয়ে যায়। কিন্তু নিচের লক্ষণগুলো দেখলে দেরি না করে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন:

  • ত্বকের শুষ্কতা দিন দিন তীব্র হলে  
  • ত্বক ফেটে রক্ত বের হলে
  • ইনফেকশনের লক্ষণ যেমন ত্বক ফুলে গেলে, লালচে ভাব হওয়া বা পুঁজ দেখা দিলে
  • প্রচণ্ড অস্বস্তির কারণে শিশু অস্থির হয়ে কাঁদলে
  • জ্বর আসলে
  • তিন সপ্তাহের পরও ত্বক ওঠা বন্ধ না হলে
ToguMogu Logo

ToguMogu is a parenting app offering essential support from family planning to raising children up to age 10.

ToguMogu

Contact

  • +88 01958636805 (Customer Care)
  • [email protected]
  • House 9, Sonargaon Janapath Road, Sector 12, Uttara, Dhaka 1230, Bangladesh

Copyright © 2026 ToguMogu All rights reserved.