নবজাতক শিশুর জীবনের প্রথম দিনগুলোতে আপনার ছোট্ট সোনামণি বেশিরভাগ সময় ঘুমিয়ে, খেয়ে এবং কান্নার মাধ্যমে তার প্রয়োজন জানিয়ে কাটিয়ে দেয়। তবে সে যখন শান্তভাবে জেগে থাকে, তখনই শুরু হয় চারপাশকে চেনা, শেখা,এবং আপনার সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ সময়।
এ সময় আপনার মনে প্রশ্ন আসতে পারে, “এত ছোট্ট শিশুর সাথে কীভাবে খেলব?” মজার বিষয় হলো তাদের কাছে চারপাশের সবকিছুই একদম নতুন। তাই আপনার দৈনন্দিন কাজের মধ্য দিয়েই তাদের সাথে সুন্দর কিছু মুহূর্ত তৈরি করে নেওয়া খুব সম্ভব। এরজন্য অনেক খেলনা বা অর্থপূর্ণ গল্পের প্রয়োজন নেই। আপনার উপস্থিতি আর একটু ভালোবাসাপূর্ণ মনোযোগই তাদের জন্য যথেষ্ট।
নবজাতকের সাথে কখন থেকে খেলা শুরু করবেন?
শিশুকে প্রথমবার কোলে নেওয়ার মুহূর্ত থেকেই তার শেখা ও অনুভূতির যাত্রা শুরু হয়। সে আপনার মুখের দিকে তাকায়, আপনার গলার আওয়াজ শোনে এবং আপনার শরীরের উষ্ণতা অনুভব করতে পারে। শিশুর জীবনের প্রথম দিনগুলোতে খেলা বলতে আসলে এই ছোট্ট মুহূর্তই বোঝায়।
দিনের অধিকাংশ সময় ঘুমালেও মাঝেমধ্যে শিশুরা বেশ শান্ত কিন্তু সজাগ থাকে। তারা যখন আশপাশে তাকায় এবং মনোযোগ দেওয়ার মতো মেজাজে থাকে, ঠিক তখনই তাদের সাথে ছোটখাটো কোনো সহজ খেলায় মেতে ওঠার সেরা সময়।
খেলাধুলা কেন গুরুত্বপূর্ণ
শিশুরা জন্ম থেকেই শিখতে শুরু করে। তারা যখন চারপাশের সবকিছু দেখে, শোনে, খেলে এবং আশপাশটা অনুভব করে, তখন তাদের মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটে। আপনিই আপনার শিশুর প্রথম শিক্ষক, আর বড় হওয়ার সাথে সাথে সে আপনার কাছ থেকেই শিখতে থাকে।
পারস্পরিক যোগাযোগ ও বিশ্বাস: খেলাধুলা আপনাদের দুজনকে একে অপরকে চিনতে ও বুঝতে সাহায্য করে। যা শিশুর মনে আপনার প্রতি নিরাপত্তার অনুভূতি, বিশ্বাস রাখতে ও নির্ভর করতে শেখায়।
মস্তিষ্কের বিকাশ: শিশু কোনো শব্দ বা অঙ্গভঙ্গি করলে আপনি তার সাড়া দিন। এই ভাবের আদান-প্রদান তাদের ছোট্ট মস্তিষ্কে নতুন নতুন চিন্তার সংযোগ তৈরি করে।
ভাষার ভিত্তি তৈরি: নিয়মিত কথা বলা ও ছড়া শোনানো শিশুকে শব্দের অর্থ বুঝতে সাহায্য করে, যা পরবর্তীতে তার কথা বলার ভিত্তি গড়ে তোলে।
শারীরিক নিয়ন্ত্রণ: হাত-পা নাড়াচাড়ার মাধ্যমে তারা নিজের শরীর সম্পর্কে ধারণা পেতে শুরু করে।
স্বভাব ও ব্যক্তিত্ব: শিশু কীভাবে খেলছে এবং খেলার সময় কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, তা খেয়াল করলে তার স্বভাব ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। যেমন, আপনি যখন কোনো মজার মুখভঙ্গি করবেন, কিছু শিশু গম্ভীর মুখে ভ্রু কুঁচকে আপনার দিকে তাকিয়ে থাকবে, আবার কিছু শিশু হয়তো মজা পাবে! তাদের এই প্রতিক্রিয়া দেখেই আপনি বুঝতে পারবেন তারা কোনটা পছন্দ করছে।
পরিচিতির সূচনা: শিশুর সাথে খেলার মাধ্যমে আপনি তাকে নিজের সম্পর্কে, আপনার সম্পর্কে এবং চারপাশের জগত সম্পর্কে জানতে সাহায্য করেন।
০–৩ মাসের শিশুর সাথে খেলার সহজ কিছু উপায়
- টামি টাইম
দিনে মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য হলেও টামি টাইম দেওয়াকে খেলার মতো মজার করে তুলতে পারেন। টামি টাইম আপনার শিশুর ঘাড়, পিঠ এবং কাঁধের পেশি শক্ত হতে সাহায্য করে।
যেভাবে করবেন:
১। এসময় ওদের আগ্রহ বাড়াতে আপনি নিজেও তার চোখ বরাবর নেমে এসে কথা বলুন, ছড়া বলুন, রঙিন খেলনা বা আয়না টয় রাখতে পারেন।
২। ধীরে ধীরে একপাশ থেকে অন্যপাশে শব্দ করে তাকে মাথা নাড়িয়ে শব্দের উৎসের দিকে তাকানোর সুযোগ দিন।
সতর্কতা: টামি টাইম সবসময় শিশুর জেগে থাকা অবস্থায় এবং প্রাপ্তবয়স্কের তত্ত্বাবধানে করাতে হবে।
- শিশুর সাথে কথা বলা
এই বয়সে আপনার শিশু কথা বলতে না পারলেও আপনার কণ্ঠস্বর তার সবচেয়ে প্রিয়। নিয়মিত কথা বলা ভাষা শেখার ভিত্তি তৈরি করতে সাহায্য করে। তাছাড়া এই কথা বলার মধ্যে দিয়ে আপনার সাথে বন্ধন গভীর হওয়ার সাথে সাথে তার আশেপাশের পরিবেশ চিনতে শিখবে।
যেভাবে করবেন:
১। প্রতিদিনের কাজের সময় তার চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে কথা বলুন। “এখন আমরা জামা বদলাচ্ছি” বা “মা তোমাকে কোলে নিচ্ছে।” এভাবে কথা বলতে পারেন।
২। সে কোনো আওয়াজ করলে তার জবাবে আপনিও কথা বলুন।
৩। এমনকি কোলে নিয়ে বাসার ভিতরে বা বাহিরে নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন জিনিস দেখিয়ে তা নিয়ে কথা বলতে পারেন।
৪। কথা বলার সময় তাকে আপনার মুখ দেখার এবং বোঝার জন্য কিছুটা সময় দিন।
জেনে রাখা ভালো: এবয়সী শিশুরা আপনার কণ্ঠস্বর খুব ভালো চেনে এবং তা মন দিয়ে শোনে। তবে হঠাৎ কোনো আওয়াজ বা আপনার গলার শব্দ শুনলে সে মাঝেমধ্যে কিছুটা চমকে উঠতে পারে। এতে ভয়ের কিছু নেই, এই বয়সের শিশুদের জন্য এটি একেবারেই স্বাভাবিক রিফ্লেক্স।
- গান ও ছড়া শোনানো
শিশুরা সুর ও ছন্দ খুব পছন্দ করে। তাই গান বা ছড়া শোনানো তাদের জন্য আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা হতে পারে।
যেভাবে করবেন:
১। ছড়া যেমন “হাট্টিমা টিম টিম” বা “Wheel On The Bus” বলতে পারেন।
২। ছড়াতে সুর করে, ছন্দের তালে তালে এবং অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে শোনাতে পারেন, যাতে তারা আনন্দের সাথে শিখতে পারে।
৩। আপনার গানের গলা কেমন, তা নিয়ে ভাবার প্রয়োজন নেই। শিশুর কাছে আপনার কণ্ঠই পৃথিবীর সেরা সুর।
৪। শিশুর সামনে বসে ধীরে ধীরে একই ছড়া বারবার বলা শিশুর শেখার জন্য ভালো।
- বিভিন্ন ধরনের খেলনা
সফট টয়, শব্দ করা (উচ্চ শব্দের না হয়ে নরম শব্দের খেলনা বেছে নিন), রঙ্গিন খেলনা শিশুকে দিতে পারেন। এমনকি বাসাবাড়ির প্রতিদিনের ব্যবহার করা চামচ, ছোট বোতলও তাদের খেলনা হতে পারে।
যেভাবে করবেন:
১। নরম, চাপ দিলে শব্দ করা খেলনা, বিভিন্ন টেক্সচারের বল ব্যবহার করতে পারেন।
২। বাসায় প্লাস্টিকের বোতলে চাল বা ডাল দিয়ে শেকার তৈরি করতে পারেন, তবে খেয়াল রাখবেন যেন বোতলের মুখটি শক্ত করে আটকানো থাকে এবং কোনো ধারালো অংশ না থাকে।
৩। পশুপাখির স্টাফড টয় দেখিয়ে তাদের ডাক অনুকরণ করতে পারেন।
৪। এমনকি তাদের কাছে সবকিছু নতুন হওয়ায় বাসাবাড়ির প্রতিদিনের ব্যবহার করা চামচ, রিমোট, বোতলও তাদের খেলনা হতে পারে।
সতর্কতা: ছোট অংশ খুলে যেতে পারে এমন খেলনা ব্যবহার করবেন না।
- আয়না নিয়ে খেলা
আয়না নিয়ে খেলা শিশুদের জন্য মজার একটি খেলনা। তারা মুখভঙ্গি দেখতে খুব পছন্দ করে, এমনকি নিজেকে দেখতেও!
যেভাবে করবেন:
১। শিশুকে আয়নার সামনে নিয়ে বলবেন পারেন, “দেখো, এটা তুমি! এটা তোমার নাক!”
২। জিভ বের করা, ভুরু তোলা বা বড় করে হাসার মতো মজার মুখভঙ্গি করে তাকে দেখান।
৩। আপনাকে অনুকরণ করার চেষ্টা করলে তাকে উৎসাহ দিন।
- বই পড়ে শোনানো
বইয়ের প্রতি আগ্রহ গড়ে তোলার জন্য কোনো বয়সই কখনোই খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যায় না। ছোটবেলা থেকেই বই পড়ায় শিশুর ভাষার বিকাশ, মনোযোগ আর শোনার দক্ষতা গড়ে উঠে।
যেভাবে করবেন:
১। সাদা-কালো বা গাঢ় রঙের ছবিওয়ালা বোর্ড বুক বা কাপড়ের বই দেখিয়ে গল্প বলুন।
২। ছবিগুলো আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে গল্প বলুন।
৩। পশুপাখির ছবির বই হলে তাদের ছবি দেখিয়ে বলুন, “দেখো গরু! হাম্বা!”
৪। স্বর ওঠানামা এবং বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি ব্যবহার করে মজা করে পড়ুন।
কখন খেলা থামিয়ে দিবেন?
শুরুতে খেলার এই সময়টুকু হয়তো খুব ছোট হবে। কারণ নবজাতক খুব দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং একটি বিষয়ে বেশিক্ষণ নজর ধরে রাখতে পারে না। শিশু কখন ক্লান্ত হয়ে পড়ছে তা বোঝার জন্য তার এই ইশারাগুলো খেয়াল করুন:
- বারবার হাই তোলা
- অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়
- অস্থির হয়ে যাওয়া
- কান্না শুরু করলে
- পিঠ বাঁকানো বা ছটফট করা
এমন সংকেত দেখলে খেলা থামিয়ে তাকে শান্ত হওয়ার সময় দিন, খাওয়ান বা ঘুম পাড়ানোর ব্যবস্থা করুন।
মূল কথা
যদিও ছোট শিশুরা নিজে নিজে খুব বেশি কিছু করতে পারে না, তবুও আপনার সাথে কাটানো প্রতিটি মুহূর্তেই তারা আনন্দ পায়। মুখ বাঁকিয়ে মজার ভঙ্গি করা বা কোনো ছড়া গাওয়ার মতো ছোট ছোট মুহূর্তগুলোও তাদের বিকাশে ভালো ভুমিকা রাখতে পারে। প্রতিদিনের এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই আপনার শিশুর সঙ্গে গভীর বন্ধন তৈরি করে এবং তাকে পৃথিবীকে চিনতে সাহায্য করে।
তাই দামি খেলনা বা সরঞ্জাম নিয়ে একদম ভাববেন না। আপনার শিশুর সাথে খেলার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শুধুই আপনি!