দাঁতের যত্নের কথা ভাবলেই সাধারণত আমাদের চোখে ভেসে ওঠে টুথব্রাশ আর টুথপেস্টের ছবি। কিন্তু শিশুদের প্রথম দাঁত ওঠারও আগে থেকেই দাঁতের যত্ন শুরু হয়। শুনতে অবাক লাগলেও, শৈশবে শিশুদের মাড়ি পরিষ্কার ও সুস্থ রাখা হলো সারাজীবনের মজবুত দাঁত ও সুন্দর হাসির ভিত্তি গড়ে তোলার প্রথম ধাপ।
জন্মের পর থেকেই শিশুর মুখের যত্ন নেওয়া শুরু করা উচিত। প্রতিদিনের সামান্য একটু যত্নের মাধ্যমেই আপনি আপনার শিশুর দীর্ঘমেয়াদী মুখের স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে পারেন এবং ভবিষ্যতে দাঁতের নানাবিধ সমস্যা এড়াতে পারেন।
দাঁত ওঠার আগেই কেন শিশুর মাড়ির যত্ন নিবেন?
নবজাতকদের কোনো দাঁত না থাকলেও মুখের ভেতরটা নিষ্ক্রিয় নয়। প্রতিবার দুধ খাওয়ার পর শিশুর মুখে প্রাকৃতিক চিনি এবং ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করে, যা মাড়িতে জমা হতে পারে। সঠিক যত্ন না নিলে এই ব্যাকটেরিয়াগুলো নরম টিস্যুর ক্ষতি করতে পারে এবং এমনকি নতুন দাঁত ঠিকভাবে উঠার জন্যও বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
শৈশব থেকেই মাড়ির যত্ন নেওয়ার সুফলগুলো হলো-
- নতুন দাঁত উঠার জন্য মাড়ি সুস্থ রাখা
- শৈশবে দাঁত ক্ষয় হওয়া (ক্যাভিটি) রোধ করা
- ভবিষ্যতে ব্রাশ এবং ফ্লস করার অভ্যাস সহজেই করে তোলা
- মাড়ির ইনফেকশন বা মুখের সাদা ছত্রাকজনিত ইনফেকশন (ওরাল থ্রাশ)-এর ঝুঁকি কমানো
এই শুরুর যত্নটাকে ব্রাশ শুরু করার আগের ছোট্ট প্রস্তুতি বা ‘ওয়ার্ম-আপ’ হিসেবে ভাবতে পারেন। যা সহজ হলেও অত্যন্ত কার্যকর।
শিশুর মাড়ির যত্ন নেওয়ার সহজ উপায়
আপনার শিশুর মাড়ির যত্ন নেওয়ার মাধ্যমে মুখের স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রথম ধাপ শুরু করার জন্য বিশেষ কিছুর প্রয়োজন নেই। এমনকি শিশুর প্রথম দাঁত ওঠার আগেই (জন্মের পর থেকেই) এই যত্ন শুরু করা উচিত। এরজন্য প্রয়োজন কেবল একটি কোমল স্পর্শ, পরিষ্কার হাত এবং একটি নিয়মিত রুটিন।
১) প্রতিবার খাওয়ানোর পর আলতো করে মাড়ি মুছে দিন
বুকের দুধ বা ফর্মুলা দুধই হোক না কেন, প্রতিবার খাওয়ানোর পর শিশুর মাড়ি পরিষ্কার করা একটি ভালো অভ্যাস। প্রতিবার খাওয়ার পর পরিষ্কার করা সম্ভব না হলে দিনে অত্যন্ত দুইবার এবং রাতে ঘুমানোর আগের খাওয়ানোর পর এটি করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুর দাঁত ওঠার আগে তার মাড়ি পরিষ্কার করার সহজ নিয়মগুলো ধাপে ধাপে দেওয়া হলো:
হাত ভালোভাবে ধুয়ে নিন
সবসময় মাড়ি পরিষ্কার করার আগে প্রথমেই হাত ভালোভাবে ধুয়ে নিন, যাতে বাইরের জীবাণু আপনার শিশুর মুখের ভিতরে না ছড়ায়।
পরিষ্কার করার উপকরণ প্রস্তুত করুন
- ৩ থেকে ৪ মাস বয়সের আগে কুসুম গরম পানিতে ভেজানো একটি নরম ও পরিষ্কার সুতি কাপড় আপনার তর্জনী আঙুলের চারপাশে পেঁচিয়ে নিন।
- শিশুর ৩ থেকে ৪ মাস বয়সের পর পানিতে নরম সিলিকন ফিঙ্গার ব্রাশ ভিজিয়ে ব্যবহার করতে পারেন (শিশু সলিড খাবার খাওয়া শুরু করার আগে পর্যন্ত কোনো টুথপেস্ট ব্যবহার করবেন না!)।
- শিশুর প্রথম দাঁত মাড়ি বের হওয়া শুরু করলে নরম সিলিকন ফিঙ্গার ব্রাশের বদলে একটি নরম ও ছোট বেবি টুথব্রাশ এবং বয়সোপযোগী টুথপেস্ট ব্যবহার করা শুরু করবেন।
উভয়পাশের মাড়ি পরিষ্কার করুন
ভেজা কাপড় বা ফিঙ্গার ব্রাশ দিয়ে আস্তে আস্তে বৃত্তাকার গতিতে প্রথমে উপরের, তারপর নিচের মাড়ি ঘষে পরিষ্কার করুন, যাতে জমে থাকা দুধ ও ব্যাকটেরিয়ার স্তর দূর হয়।
আপনার শিশু বাধা দিলে বা মুখ শক্ত করে বন্ধ করে রাখলে তাকে মুখ হাঁ করাতে উৎসাহিত করতে আলতো করে তার নিচের ঠোঁটে একটু সুড়সুড়ি দিন।
জিহ্বা ও গালের ভেতরের অংশ পরিষ্কার করুন
ভেজা কাপড়ের একটি পরিষ্কার অংশ দিয়ে জিহ্বার উপরে এবং গালের ভেতরের অংশে আলতো করে মুছে নিন, যাতে দুধের অবশিষ্টাংশ পরিষ্কার হয়ে যায়।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন
মুখের ভেতর যেন আবার ব্যাকটেরিয়া না ছড়ায়, তা নিশ্চিত করতে সবসময় পরিষ্কার নতুন কাপড় ব্যবহার করুন বা কাপড় / নরম সিলিকন ফিঙ্গার ব্রাশটি বারবার ভালোভাবে ধুয়ে শুকিয়ে রাখুন।
টিপস: আপনার শিশু মাড়ি পরিষ্কার করতে না চাইলে জোর না করে খেলার ছলে মজা করে করতে পারেন। তবে কখনোই জোর করে বা জোরে ঘষা দিয়ে মাড়ি পরিষ্কার করবেন না।
২) মুখে ফিডার নিয়ে ঘুমানোর অভ্যাস এড়িয়ে চলুন
মুখে ফিডার দিয়ে শিশুকে ঘুমাতে দেওয়াটা ক্ষতিকারক মনে নাও হতে পারে, তবে এই অভ্যাসের কারণে ‘ফিডারের কারণে দাঁত ক্ষয়’ (Baby Bottle Tooth Decay) হতে পারে। বুকের দুধ বা ফর্মুলা দুধে প্রাকৃতিকভাবেই যে চিনি (ল্যাকটোজ) থাকে, ঘুমের সময় দীর্ঘক্ষণ মাড়িতে তার আস্তরণ জমে থাকলে তা পরবর্তীতে গজাতে থাকা দাঁতের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। এটি এড়ানোর উপায়:
- শিশু সত্যিই খাচ্ছে এবং জেগে আছে, এমন সময়েই কেবল ফিডার দিন।
- রাতে ঘুমানোর সময় শান্ত করার প্রয়োজন হলে ফিডারের বদলে প্যাসিফায়ার দিতে পারেন।
- রাতে শেষবার খাওয়ানোর পর সবসময় মাড়ি মুছে দিন।
৩) প্রতিদিনের একটি নিয়মিত রুটিন অনুসরণ করুন
দাঁত ওঠার আগেই মাড়ি যত্নের এই রুটিন গড়ে তুললে শিশু ধীরে ধীরে দাঁত পরিষ্কার করার প্রক্রিয়ার সাথে সহজে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। প্রতিদিনের এই কয়েকটা মিনিট আপনার ও শিশুর মাঝে একটি নিবিড় বন্ধনের গড়ে উঠার মুহূর্তও হয়ে উঠতে পারে।
এই অভ্যাসগুলো জলদি শুরু করলে, শিশুরা বড় হওয়ার পর ব্রাশ করতে আপত্তি জানায় না এবং পুরো শৈশব ও পরবর্তী জীবনেও মুখের সঠিক যত্ন বজায় রাখার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।
কখন ডাক্তার দেখাবেন
নিচের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে শিশু বিশেষজ্ঞ বা ডেন্টিস্টের সাথে যোগাযোগ করবেন:
- মুখের সাদা ছোপ যা মুছলেও যায় না (এটি ওরাল থ্রাশের লক্ষণ হতে পারে)
- মাড়িতে অবিরাম রক্তপাত বা ফোলাভাব
- দাঁত ওঠার সাথে উচ্চ জ্বর বা শিশু অস্বাভাবিক রকম অসুস্থ বোধ করা।
শেষ কথা
আপনার শিশুর মাড়ির যত্ন নেওয়া শুরু করার জন্য প্রথম ছোট্ট দাঁতটি উঠার অপেক্ষা করার কোনো প্রয়োজন নেই। আজকে আপনার নেওয়া প্রতিটি ছোট পদক্ষেপ গড়ে তুলবে সারাজীবনের সুস্থ ও আত্মবিশ্বাসী হাসির পথ।